রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা যা শিখিনি


প্রকাশের সময় :৮ মে, ২০২০ ১২:১১ : পূর্বাহ্ণ

শরীফুল আলমঃ

আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনি একটু ভিন্ন ভাবে।রবীন্দ্র প্রেম আমাদের বহু আগে থেকেই ছিলো,আছে,থাকবে।তাঁর জন্ম-মৃত্যু তিথিতে তাকে নিয়ে নানাভাবে আমাদের আবেগ প্রকাশ করি।আর আবেগ থাকাটাই স্বাভাবিক।কারণ,তাঁর লেখা না থাকলে বাংলা সাহিত্যের আলমারির বিশাল বড় একটা তাক খালি রয়ে যেত,সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
তিনি আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন নানা ভাবে-নানা উপায়ে।
সে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলবো না।

আমার কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ কী করে একজন ‘রবীন্দ্রনাথ’ হয়েছিলেন সেই প্রশ্ন কী কখনো আমরা নিজেদের করেছি?
আশি বছরের জীবনে ৫২ টি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ, দুই হাজারেরও বেশি গান, ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা রবীন্দ্র রচনাবলী নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।তাছাড়া তার সামগ্রিক চিঠিপত্র উনিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।শেষ জীবনে এসে তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত নৃত্যশৈলীও রয়েছে যা “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত।

 

 

একজন মানুষ কী করে এতো লিখেছেলেন, এতো কিছু সৃষ্টি করেছিলেন? আমি শুধু উনার সৃষ্টির পরিমাণটা দিয়েই এখানে উনাকে দেখার চেষ্টা করছি। আমার চোখে এই রবীন্দ্রনাথকে একজন ‘শ্রমিক’রবীন্দ্রনাথ মনে হয়। হ্যাঁ শ্রমিক বলছি এই কারণে যে
উনি নিরলসভাবে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। একটা মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে নিস্তার দেন নি। প্রতিদিন নিজেকে নতুন কিছু সৃষ্টির জন্যে তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন। ক্রমাগত নিজের উপর অত্যাচার করে নিজের সেরাটা বের করে এনেছেন। একজন শ্রমিক যেমন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে নিজের মজুরি নিয়ে পরিবারের কাছে হাসিমুখে ফিরে।

 

ঠিক তেমনিভাবে রবীন্দ্রনাথও নিজের উপর ক্রমাগত শাসনের ফলেই একটি মহীরুহতে পরিণত হতে পেরেছিলেন। একবারের জন্য তাঁর সৃষ্টি তাকে তৃপ্তি দিতে পারেনি, নিজের ভিতরে দাম্ভিকতার জন্ম দিতে পারেনি।তিনি কখনো তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন নি।

কিন্তু দুঃখের বিষয়,
এই ‘শ্রমিক রবীন্দ্রনাথ’ কে আমরা আসলে গ্রহণ করিনি। আমরা তাঁর সৃষ্টিকে নিয়েছি ঠিকই কিন্তু তাঁর সৃষ্টির পিছনের আলোটাকে নেই নি। ক্রমাগত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে আউড়ে গেছি,অনুসরণ করেছি, অনুকরণ করেছি।

 

এখনো তথাকথিত কবি পরিচয়ে অনেক স্রষ্টা পাওয়া যায় যাদের সৃষ্টি রবীন্দ্র বলয় থেকে বের হতে পারেনি। এটা নিয়ে অবশ্য আমার কোন আক্ষেপ নেই। আমার আক্ষেপ অন্য জায়গায়, সেটা হচ্ছে আজ যদি আমরা সামান্যতমও চেষ্টা করতাম রবীন্দ্রনাথ যেভাবে সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন, সেভাবে আমাদের তৈরি করতে ,তাহলে হয়তো আমরা আজ অন্যরকম এক বাঙালি জাতিতে পরিণত হতাম।
কিন্তু সত্য এটাই আমরা রেডিমেড সবকিছু ভাবতে,বানাতে,চিন্তা করতে পছন্দ করি। এবং পছন্দ করতেই আমরা অভ্যস্ত।

 

 

৯০ শতকের পর এই বাংলার শক্তিশালী লেখক পাওয়া দুষ্কর। মৌলিক কোন চিন্তা আমাদের বিশেষভাবে আলোড়িত,অনুপ্রাণিত করেছে এমন সৃষ্টি প্রায় হাতে গুনা। এমনি আমাদের চলমান তরুণ প্রজন্মকে যদি পাঁচজন কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর নাম বলতে বলা হয়, তারাও কিছুক্ষণ আমতাআমতা করে ষাট কিংবা সত্তরের দশকে ফিরে যাবে।
এই সামগ্রিক ছবিটির জন্যে আসলে আমরাই দায়ি। কারণ আমরা আমাদের নিয়ে সন্তুষ্ট।যেমনি বুদ্ধিজীবীরা সমাজ নিয়ে-দেশ নিয়ে সন্তুষ্ট, শিক্ষাবিদ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট তেমনি পরিবেশবিদ পরিবেশ নিয়ে, কবি তার কবিতা দিয়ে,সাংবাদিক তার সংবাদ নিয়ে সরকার তার শাসন ব্যবস্থা নিয়ে, শ্রমিক তার মজুরি নিয়ে, শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা নিয়ে, সবাই সবকিছু নিয়েই সন্তুষ্ট।

 

এই সন্তুষ্টিই আমাদের আজ দুর্বল করে ফেলে রেখেছে। চোখ বন্ধ করে রেখেছে নতুনের সন্ধান থেকে। তাই আমার মনে হয়, প্রতিবছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যু তিথিতে আমরা যতটা তাকে স্মরণ করি, যদি তার কিছুটা অংশ ‘শ্রমিক রবীন্দ্রনাথ’কে নিয়ে করতাম।
তাহলে হয়তো আমরাও আজকে রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে পরিচয় দিতে পারতাম।

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
মে ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল   জুন »
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১