সাংবাদিক কাজল বনাম সাংবাদিকের স্বাধীনতা


প্রকাশের সময় :৪ মে, ২০২০ ৪:৩৬ : অপরাহ্ণ

শরীফুল আলমঃ

সাংবাদিকের স্বাধীনতা বলে বাস্তবে আসলে কী কিছু আছে? নাকি এটা নেহাতই মিথ? সাংবাদিকদের স্বাধীনতা চাওয়া এই পেশার জন্মলগ্ন থেকেই চলমান দাবি। কিন্তু এ দাবি এই বঙ্গদেশে আদায় হবার নয়। কিংবা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। কারণ সাংবাদিককে স্বাধীন হতে হলে আগে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন হতে হবে। আবার সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন হতে হলে সেই মাধ্যমের মালিক পক্ষকে নিরপেক্ষ হতে হবে, বিজ্ঞাপনের নামে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কূটচালের মুঠো থেকে মুক্তি পেতে হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চর্চার সুযোগ থাকতে হবে।

 

 

কিন্তু সে সুযোগ আর আমরা পাচ্ছি কই?
নিয়ম অনুযায়ী সাংবাদিক রাষ্ট্রের স্বপক্ষের শক্তি। কিন্তু বাস্তব ঠিক তার উল্টো।
এইতো গতকাল ৩ মে তারিখটি ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে গেলো সারা বিশ্বে। আর আমরাও দেখলাম একজন নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাংবাদিককে আসামী বানিয়ে, নিরাপত্তা দেবার নাম করে হাতে হাতকড়া পড়িয়ে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ পালন করতে আমাদের দেশে!

 

 

এ নিয়ে আফসোস করবার কিছু নেই, এ দেশে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাসংকটের মধ্যেই আছে অনেক বছর ধরে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তৈরি সমীক্ষাগুলোতে দেখা যায়, অন্তত ২০১৩ সালের পর থেকে আমাদের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমেছে। ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২০ সালের সমীক্ষা সূচকে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১। আগের বছরের তুলনায় আমরা এক ধাপ পিছিয়েছি। দুঃখজনক বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমরাই সবচেয়ে পিছিয়ে আছি।

 

 

আমাদের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট বহুলাংশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অকার্যকারিতা ও দুর্বল গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহল অনেক সময়েই স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্র পরিচালনার সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই বিবেচনা থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য প্রতিকূল ও সাংবাদিকদের জন্য বিপজ্জনক কালাকানুন প্রণয়ন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ব্যাপক সমালোচনার মুখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে অধিকতর কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার অপপ্রয়োগের অন্য কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

 

যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কল্যাণেই আজ কারাভোগ করছেন সাংবাদিক কাজল।গত ১০ মার্চ সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ সাংবাদিক কাজল। তার কোনও সন্ধান না পেয়ে পরদিন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন কাজলের স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসি নয়ন। ১৩ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে শফিকুল ইসলাম কাজলকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত দেয়ার দাবি জানায় পরিবার। নিখোঁজের সাতদিন কেটে গেলেও কাজলের কোনও সন্ধান দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ১৮ মার্চ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে সাংবাদিক কাজলের সন্ধান চাওয়া হয়। সন্ধান চাওয়া হয়।

 

 

গত ২ মে শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে ভারত থেকে হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় তাকে আটক করা হয় সাংবাদিক কাজলকে। পাসপোর্ট আইনের মামলা ও ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে রোববার (৩ মে) বিকালে তাকে যশোরের আদালতে সোপর্দ করা হয়।
এর আগে তাকে বেনাপোল পোর্ট থানার পুলিশ হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বিশেষ নিরাপত্তা(!) দিয়ে যশোরে নিয়ে আসে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিমধ্যে হয়েছে ব্যাপক সমালোচনাও।

 

 

এক প্রশ্নের জবাবে বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মামুন খান বলেন, আসামি কাজলের হাতে হ্যান্ডকাপ পরানোয় আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

 

 

অথচ ১৯৪৩ সালের যে পুলিশ আইন তাতে, হাতকড়া পরানোর কথা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। তবে পালিয়ে যাওয়ার বা বল প্রয়োগের আশঙ্কা থাকলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সাংবাদিক কাজলের কি পালানোর বা বল প্রয়োগের কোনো সম্ভাবনা ছিল? কাজলের নিখোঁজ বা অপহরণের বিষয়টি এদেশে কে না জানতেন? বিজিবি, পুলিশ কারোরই অজানা থাকার কথা নয়। কাজল নিজেও নিশ্চয় বিজিবিকে পরিচয় দিয়েছে। পুলিশ অবগত ছিল বা কাজলের থেকে জেনেছে। তারপরও পুলিশ মনে করেছে যে কাজল পালিয়ে যাবে! অথচ সাত খুনের আসামিদেরও হাতকড়া ছাড়া আদালতে আনতে দেখা গেছে।

 

 

কাজল বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকতে গিয়ে বিজিবির হাতে গ্রেপ্তার হননি। কেউ দেখেনি যে কাজল বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকছিলেন বা ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকছিলেন। ভারতীয় বিএসএফ তাকে গ্রেপ্তার করলে সেটা হতো অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ। কাজলকে বিজিবি গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশের মাটি থেকে। কাজল ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, এটা বিজিবি অনুমান করেছে। এটা পাসপোর্ট ছাড়া দেশে প্রবেশের অনির্দিষ্ট অপরাধ করার অভিযোগ, অনুপ্রবেশের অভিযোগ নয়। কিন্তু বলা হচ্ছে কাজলের নামে অনুপ্রবেশের মামলা করা হয়েছে।

 

 

যে মামলা হয়েছে, তাতে তিনি জামিন পেলেও ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারচেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয় নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তার নামে মামলা আছে।

 

 

জানা গেছে, যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেলকেন্দ্রিক কারবারে জড়িতদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তাতে আসামির তালিকায় শফিকুল ইসলাম কাজলের নামও রয়েছে। মাগুরা-১ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর গত ৯ মার্চ শেরেবাংলানগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই মামলাটি করেন।

 

 

এই তো গেলো সাংবাদিক কাজলের গল্প। এরকম কতো কাজল আইনের মারপেঁচ আর হুমকির মুখে পড়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার চর্চা করেন এদেশে তার সঠিক হিসাব বোধহয় পাওয়া সম্ভব নয়।

 

তবুও বলবো সাংবাদিকতা পেশাটাই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলবার জন্যে। ইতিহাসে এরকম কাজল বার বার হত্যা-গুম-নিখোঁজ-কারাভোগ করলেও নতুন কাজলরা ঠিকই সাংবাদিকতার স্বাধীনতার দাবি নিয়ে সামনে এসেছে।ভবিষ্যতেও আসবে।

তথ্যঋণ: বিভিন্ন গণমাধ্যম

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
মে ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল   জুন »
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১