‘শব্দহীনতা’ এ কোন কারাগার নাকি নিজের অপারগতা?


প্রকাশের সময় :২ মে, ২০২০ ৬:০২ : অপরাহ্ণ

শরীফুল আলমঃ

মার্কিন কবি ও সমাজকর্মী মায়া এন্জেলো বলেছিলেন, মানুষের ভেতরে না-বলা-কাহিনির যে বেদনা, এর চেয়ে পীড়াদায়ক আর কিছু নেই।

 

 

আমাদের নিজেদের মধ্যে নিজেদের দ্বন্দ্ব অনেক।একে বলে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব।এই দ্বন্দ্বে পড়েই আমরা মাঝে মাঝে ভাবতে ভুলে যাই,প্রতিনিয়ত একটা চক্রাকার অজানা বৃত্তের মধ্যে পাক খেতে থাকি। আর তাই নতুন কিছু ভাবাও হয় না। যদিও কিছু ভাবনা আসে সেগুলো এলোমেলো,
অগোছালো। এই ভাবনাগুলো আর শব্দের শরীরে দাঁড়াতে পারে না।

 

এই পর্যায়টার আমি নাম দিয়েছি শব্দহীনতা। আপনি একই সময়ে অনেক কিছুই ভাবছেন কিন্তু লিখতে পারছেন না। আবার আপনার চারপাশে ভাববার মতো এমন অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে।কিন্তু আপনি গঠনমূলক কিছুই ভাবছেন না বা ভাবতে পারছেন না।এক অজানা নির্লিপ্ততায় ডুবে আছেন।
আর এই দুটির ফলাফলই এক।সেটি শব্দহীনতা।
যারা নিয়মিত নিজেকে শব্দের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে অভ্যস্ত তাদের কাছে এটি রীতিমতো কারাভোগ। এক অসহ্য যন্ত্রণা।

 

 

বিখ্যাত অনেক লেখকরাও এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। বর্তমান অনেক লেখকরা এ নিয়ে একটি মিথের ধারণাও দিয়েছেন।তার নাম “রাইটার্স ব্লক”। হ্যাঁ, রাইটার্স ব্লককে মিথ-ই বলবো, কারণ এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানুষ চাইলে তার সচেতন চিন্তা-ভাবনা ও ইচ্ছা শক্তি দিয়ে ‘রাইটার্স ব্লক’ কে অনায়েসেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।তার উপায় নিয়েও কিছু কথা বলবো পরে।

 

 

তার আগে লেখক দুনিয়া নিয়ে আরও কিছু কথা বলি,
লেখার জন্য ‘ভাবনার স্বাধীনতাকে’ বিবেচনায় এনে, দুনিয়ার লেখককুলকে দু’ভাগে ভাগ করে নিতে পারি আমরা। একদলের নাম দেয়া যায় গণ্ডিভুক্ত লেখক। আরেক দলের নাম গণ্ডিমুক্ত লেখক। গণ্ডিভুক্ত লেখক কারা?
যারা সবসময় লেখার জন্য একটি অজুহাত/কারণ/উসকানির প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। একটা ধাক্কার দরকার হয় তাদের।
এবার গণ্ডিমুক্ত লেখকদের কথায় আসা যাক্। কবি টাইপের এই লেখকেরা একটু স্বাধীনচেতা। কবি টাইপ বলতে অত্যাবশ্যকভাবে কবি বা কবিতার লেখককে বলছি না। কবিতার লেখক হতে পারেন, অথবা গল্প/প্রবন্ধের লেখকও হতে পারেন। লেখক মানসকে বুঝাচ্ছি। তারা চলন্ত গাড়িতেও দিব্বি লিখে যান! হাঁটতে দৌড়াতে সাঁতার কাটতে ওয়ার্কআউটে ঘুমাতে ইয়ে করতে সবকিছুতে তারা লিখে চলেন। কলম নিয়ে অথবা কলম ছাড়া। কমপিউটারে অথবা শূন্য আকাশে। লিখে অথবা না লিখে। সকল অবস্থায় তারা লিখে চলেন। কিছু লেখা কাগজে পায় প্রকাশ, কিছু লেখা থেকে যায় মস্তিষ্কে। লেখা থেমে থাকে না।

 

 

মনের ভেতর একটি অদৃশ্য দেয়ালের কারণে গভীর জীবনদর্শন থাকলেও অনেকেই লিখতে পারে না। তার আত্মপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল। নিজে ছাড়া কেউ তা জানে না। এরা মূলত গন্ডিভুক্ত লেখকদের দলে। এ ধরণের লেখক আসলে প্রতিনিয়ত একটা উপযুক্ত কারণ কিংবা ইস্যু খুঁজতে থাকেন লিখার জন্য। কিন্তু নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও হতাশায় পরে একসময় এই কারণ খুঁজাও বাদ দেন। কিংবা হাজার কারণ থাকলেও আর চোখে পড়ে না এদের। তাই তাঁরা একসময়
শব্দহীনতায় ভুগেন।

 

 

এখন প্রশ্ন হলো, এই নিজের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে কীভাবে শব্দহীনতাকে দূর করা যায়? লেখক কি সবসময়ই পরিস্থিতি-নির্ভর হয়ে থাকবেন বা থাকেন? আমি মনে করি, না। লেখার চিন্তা মাথায় থাকার পরও লিখতে না পারার এই সমস্যাটি নিতান্তই প্রাথমিক পর্যায়ের। আমরা এটাকে একসময় অযথাই সিরিয়াসলি নিয়ে নেই।

 

কিন্তু অতীতে যারা এই অবস্থায় পড়েছে তারা সবাই স্বাভাবিক নিয়মেই একে অতিক্রম করেছে, কেউবা সচেতন চেষ্টার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।

 

 

মার্কিন ছোটগল্প লেখক স্কট ফিটজেরাল্ট বলেছেন, আপনি ‘বলতে চান’ বলেই যে লিখছেন বিষয়টি তা নয়, বরং আপনার ‘বলার কিছু আছে’ বলেই আপনি লেখেন।
জীবনকে এর নিজস্বতায় না দেখলে এই বলার ভঙ্গি সৃষ্টি হয় না। তাই প্রতিনিয়ত নিজের মধ্যে বলার মতো কিছু তৈরি করুন। ‘শব্দহীনতা’র মতো কারাগার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে নিজের অপারগতা দূর করুন।
কিংবা সেই অপারগতাকেই শব্দে প্রকাশ করুন, এটিই হতে পারে আপনার শব্দহীনতা দূর করার প্রথম ধাপ।

 

এছাড়াও নিয়মিত বই পড়ুন। যেসব লেখকের লেখা আপনার পছন্দ,যাঁদের লেখা আপনার লেখক স্বত্বাকে প্রভাবিত করে তাঁদের লেখায় নিয়মিত বিচরণ করুন। নিজের মনকে শান্ত রাখুন আর অনু্ভূতিকে রাখুন তীক্ষ্ণ। কারণ আপনি হাসলে পাঠক হাসবে, আপনি কাঁদলে পাঠকও কাঁদবে।

 

সবশেষে বলবো প্রতিদিন লিখুন।যা খুশি লিখুন,কিন্তু লিখুন।
লেখার ভাব বা মান যাই হোক না কেন আপনার বাক্যটি সম্পূর্ণ করুন।
কারণ আপনার শব্দহীনতা একমাত্র শব্দ দিয়ে দূর করা সম্ভব।

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
মে ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল   জুন »
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১