আমরা যে মহান মানুষটিকে হারালাম


প্রকাশের সময় :২৮ এপ্রিল, ২০২০ ২:১৪ : অপরাহ্ণ

শরীফুল আলমঃ

১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেট শহরে প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী এবং হায়াতুন নেছা চৌধুরী কোল আলো করে আসে তাঁদের তৃতীয় সন্তান। সেই ছোট্ট শিশুটিই একদিন রূপ নিবে বটবৃক্ষে তখন কে জানতো! যাঁর বিস্তৃতি ছিলো এতো বিশাল যে তাঁর পরিচয় দেওয়াই
ছিলো কষ্টসাধ্য। তিনি কখনো ছিলেন শিক্ষাবিদ,কখনো জাতীয় অধ্যাপক, কখনো গবেষক ও বিজ্ঞানী আবার কখনো বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। কোথাও তিনি প্রকৌশলী বা তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কোথাও বুয়েটের অধ্যাপক আবার কোথাও সড়ক ও সেতু বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি পরিচয়ে ভূষিত ছিলেন তিনি।

 

 

এই মহান মানুষটির নাম অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। যদিও এই নামটি বললে আর বিশেষণ প্রয়োজন ছিল না।কারণ এই নামটাই পত্রপত্রিকায় নানা সময়ে-নানা ভাবে আমাদের সামনে এসেছে। জানিয়েছে আমাদের আশার বাণী, দেখিয়েছে আলোর পথ, জুগিয়েছে গণিত ও প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সাহস।
এই মহান মানুষটি আরেকটি নামেও পরিচিত ছিলেন অনেক মহলে।সেটি হচ্ছে জেআরসি বা অনেকের জেআরসি স্যার। তিন শব্দের বড় নাম সংক্ষেপ করে কে বা কারা এবং কখন জেআরসি পরিচয় শুরু করেন, সেটি অবশ্য জানা নেই।

 

 

পিতার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শৈশবকাল কেটেছে এই মহান স্থপতির । তিন বছর বয়সে সিলেট ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে চলে যান আসামের জোড়হাটে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে আবার সিলেটে ফিরে আসেন। এরপর তার পিতা বদলি হয়ে ময়মনসিংহে চলে যান।

 

 

তিনি ১৯৫৭ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য তিনি ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

 

 

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলাফল প্রকাশের কয়েকদিন পর নিয়োগপত্র ছাড়াই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন পুরকৌশল বিভাগে। এভাবেই তার শিক্ষকতা জীবন শুরু হল। ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বার্মাশেল বৃত্তি নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। এই বৃত্তি বছরে একটাই দেয়া হতো। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি করেন, অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। থিসিসের বিষয় ছিল, কংক্রিট বিমে ফাটল। ১৯৬৮ সালে তিনি কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং বিষয়ের উপর পিএইচডি করেন। পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

 

 

এরপর ১৯৭৩ সালে সহযোগী অধ্যাপক ও ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০১ সাল পর্যন্ত বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে কখনো বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, ডিন ছিলেন। বুয়েটের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন প্রায় ১০ বছর। ১৯৭৯ সালে ব্যাংককে UNESCAP- এ কয়েক মাস পরামর্শক হিসেবে ছিলেন। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং এসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআইটির গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

 

 

১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করতে হয়েছিল তাকে।

 

 

বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন যুক্তরাজ্যের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো। যুক্তরাজ্যের একজন চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির ফেলো। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা), বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ অধ্যাপক চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের সফটওয়্যার রফতানি এবং আইটি সার্ভিস রপ্তানী-সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি টাস্কফোর্সের একজন সদস্য। এছাড়া তিনি আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িত। সবশেষ তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

 

 

“এত বড় প্রকৌশলী হয়ে দেশে কেন রয়ে গেলেন?”—এ বিষয়ে জেআরসির বক্তব্য ছিল পরিষ্কার। বলতেন, ‘অনেকবার সুযোগ পেয়েছি, কখনো শিক্ষক হিসেবে, কখনো পরামর্শক হিসেবে। আবার আমার সমসাময়িক প্রায় সবাই বিদেশে চলে গেছেন। সেই মানসিক চাপ অনুভব করতাম। কিন্তু সব সময় মনে হয়েছে, এই দেশকে কিছু দিতে হবে। অনেকটা বিনা পয়সায় পড়েছি। এ দেশেরও তো প্রাপ্য আছে।’ একটু চাপা গলায় বলতেন, এটা দেশপ্রেমও হতে পারে। এত বড় মাপের মানুষ হলেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন। তাঁর ভাষায়, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আনন্দ পান।

 

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে অবদান রাখা ছাড়াও গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি। সুবক্তা ছিলেন। চেহারায় রাগ বা বিরক্তি ছিল বিরল ঘটনা। নিরহংকার ও সদালাপী মানুষের মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি। একুশে পদক পেয়েছেন। প্রকৌশলী সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ছিলেন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইবি) সভাপতি।

 

 

জামিলুর রেজা চৌধুরী বুয়েটসহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তিনি হতে চাননি। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলে রাজনৈতিক চাপ আসবে। ছাত্ররা আন্দোলন করবে, শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধটা এখন প্রকট। রাতের বেলাও সতর্ক থাকতে হবে, ক্যাম্পাসে কোথায়, কী হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ, শান্তিতে ঘুমাতে চাই।’

 

 

এই শান্তিপ্রিয় মানুষটিই সোমবার(২৮ এপ্রিল ২০২০) রাত ২ টার দিকে ঘুমের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। ৭৭ বছরের জীবনকালে তিনি জড়িত থেকেছেন প্রভূত মানব কল্যাণের কাজে।  এতো কাজ, এতো দায়িত্ব কীভাবে পালন করেন জানতে চাইলে তিনি বলতেন,
“কাজের মধ্যে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, যেদিন মানুষের কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে যাবে সেদিনই মানুষের মৃত্যু ঘটবে। কাজের মধ্যে নিজেকে চিনতে হবে, তাই আমি নিজের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে থাকি।”

তথ্যঋণঃ উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন গণমাধ্যম

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
এপ্রিল ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« মার্চ   মে »
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০