করোনার এই দূর্যোগ কালীন সময়ে একজন আলেমের কী সুন্দর দৈনন্দিন জীবন যাপন


প্রকাশের সময় :১৯ মার্চ, ২০২০ ৬:১৯ : অপরাহ্ণ

আরিফ মাহমুদঃ প্রতিদিনের মতো ভোরে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে গেলাম। ঘরেও নামাজ পড়তে পারতাম। কিন্তু যেহেতু আমি মসজিদ দেখাশোনা করি- তাই মসজিদে গেলাম। গিয়ে দেখি মানুষজন কেউ নেই। সবাই সরকারের আদেশ শুনেছে। ব্যাপারটি আমার খুব ভালো লেগেছে। দুনিয়ায়-সমাজে-থাকতে হলে-সবার জন্য কল্যাণকর দুনিয়ার নিয়মগুলো অবশ্যই আমাদের মেনে চলতে হবে।
মোয়াজ্জিন সাহেব এসেছেন। উনি আযান দিলেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া আপাতত বন্ধ হলেও। আযান কিন্তু এক মুহুর্তের জন্য বন্ধ হয়নি। প্রতি সেকেন্ডেই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আযানের সুমধুর সুললিত সুর ধ্বনিত হচ্ছে। আযান মানেইতো বারবার বলা – হে মানুষ তোমরা কল্যানের দিকে আসো। আর আল্লাহু আকবর মানে “আল্লাহ মহান- সব মুসলিম উম্মাহর শ্লোগান”। এ কথায় বলায়তো কোনো দোষ নেই। এই আল্লাহু আকবরকে যদি সুন্দর সুমধুর সুললিত ভাবে বলা হয়- ব্যাপারটি খুবই সুন্দর। কিন্ত এটাকে আমার এমনভাবে ব্যবহার করেছি- আল্লাহু আকবর শুনলেই মানুষ আজ মনে করে-এই বুঝি রক্তারক্তি শুরু হয়ে গেলো।

আমি একটা জিনিস গভীর ভাবে উপলব্ধি করলাম- আমরা কেউ ইচ্ছে করলে মসজিদে যেতেও পারি না ও পারি। মন না চাইলে কাজে নাও যেতে পারি। তিনমাস শরীর চর্চা করে ভালো না লাগলে ঘরে বসে থাকতে পারি। কিন্তু, ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, শীত হোক, গ্রীষ্ম হোক-রাস্তা কর্দমাক্ত হোক, শুকনা হোক-পৃথিবীর সব মুয়াজ্জিনরা নির্দিষ্ট সময়ে এসে সুবেহ সাদিকের সময় যখন রাস্তা ফাঁকা, রাতে যখন রাস্তা রিক্ত, দূর্বিপাকে যখন সবাই ঘরে মুয়াজ্জিনরা সেই সময়েও মসজিদে গিয়ে আযান দিয়েই যাচ্ছেন। নিরবিচ্ছিন্নভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মানুষকে কল্যাণের দিকে ডেকেই যাচ্ছেন। একবার এক মুয়াজ্জিনকে জিজ্ঞাসা করলাম-ভাই কেন আপনি এই কাজটি করেন?
উনি বললেন- শুধু জীবিকার জন্য করলেতো কত কিছুই করতে পারতাম। কিন্তু আমি মনে করি রাব্বুল আলামীন মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকার এই অতি উত্তম কাজটি আমাকে পছন্দ করেই আমার উপর অর্পন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই কাজটি আমি করে যেতে চাই।
এই কথা শুনে আমার হৃদয় সিক্ত হলো। চোখে অশ্রু এলো। কত সহজেই মানুষ এতো তৃপ্ত হয়। মনের অজান্তেই পৃথিবীর সব মুয়াজ্জিনকে আমি হৃদয়ের গভীর থেকে একটা ধন্যবাদ জানালাম।

যাই হোক, নামাজ শেষ করে- সামান্য কিছু কেনা কাটা করার জন্য গ্রোসারি দোকানে ঢুকলাম। এক প্যাকেট গাজর, চা পাতা কিনে চেক আউট করতে গিয়ে দেখি খুবই বৃদ্ধ এক মহিলা ক্যাশ কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। টয়লেট টিস্যু না থাকার জন্য অনুযোগ করছেন। ভাবলাম- এই বৃদ্ধ মহিলা এখন কার কাছে যাবেন, কোথায় গিয়ে তিনি সাহায্য পাবেন।

বললাম- ম্যাম আপনি কি এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবেন। যদি করেন। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।
কি মনে করলেন জানিনা। আমার পোষাক দেখে কি একটু তটস্ত হলেন- তাও জানিনা।
উনার সম্মতি পেয়ে আমি ঘরে আসলাম। দশটি টিস্যু রোল উনাকে দান করলাম।
আমার হৃদয়টা আনন্দে ভরপুর হয়ে গেলো। মহিলা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। পরোয়ার দিগারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম এই সকালে কত সুন্দরভাবে মানুষকে সেবা করার এই সুযোগটুকু রাব্বুল আলামীনকে আমাকে দিলেন। হয়তো আজ থেকে এই পোষাক পরা মানুষ সম্পর্কেই বৃদ্ধা মহিলার দৃষ্টিভঙ্গিটাই চিরদিনের জন্য বদলে যাবে।

এই প্রসঙ্গে হযরত হাসান বসরি রাঃ এর একটি ঘটনা না বললেই নয়।
হাসান বসরী রাঃ বসে আছেন। একজন লোক এসে বললেন- শুনেছি আপনি আল্লাহর বড় ওলি। আপনি বড় দরবেশ। আচ্ছা- আপনি উড়তে পারবেন। গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে থাকতে পারবেন।
হাসাব বসরী রাঃ হেসে বললেন- আপনি আমাকে পরীক্ষা করতে এসেছেন। কারামতি দেখতে এসেছেন।
একটা ছোট পাখিও আকাশে উড়তে পারে। একটি ছোট মাছও গভীর সমূদ্র ডুবে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যতো এটা না ভাই। ঐ যে দেখছেন- একজন লোক বোঝাটি বহন করতে পারছেনা। চলেন- উনাকে একটু সাহায্য করে আসি।
হাসান বসরী রাঃ বোঝা মাথায় তোলে লোকটিকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।
যার বোঝা বহন করলেন- লোকটি ছিলো একজন ইহুদি। আর হাসান বসরী বললেন- যে যত বড় মানব সেবক- সে তত বড় আল্লাহর ওলি। খেয়াল করে দেখবেন- উনি কিন্তু শুধু মুসলিম সেবক বলেন নি।

তাই, একজন মানুষের উচিত সেবার প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানো। বিশেষ করে দূর্যোগের মুহুর্তে, বিপদের মুহুর্তে। কিন্তু আমরা কি করি। সবাই এর উল্টো আচরণ করি। আমাদের এই উল্টো আচরণের কারণেই -শীতের রাতে একটা টিস্যু রোলের জন্য একজন বৃদ্ধা মহিলাকে অসহায় হয়ে গ্রোসারি দোকানে বসে থাকতে হয়।

আমি ঘরে ফিরলাম। কাপড় বদলে উষ্ন গরম পানি পান করে- দৌড়াতে বের হলাম। দৌড়ে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ভালো করে গোসল করলাম। এরপর প্রাতঃরাশ শেষ করে- এক গ্লাস চিনি ছাড়া লেবুর শরবত পান করলাম। শুধু করোনার জন্যই না। সবসময় সারা বছরের জন্যই আমাকে রাব্বুল আলামীনেের দেয়া নেয়ামত আমার শরীরটাকে আমাকে সর্বোচ্চ হেফাজত করে চলতে হবে। আমার শরীরের সুস্থ চর্চা করাও বিশাল হক পালন করা। আমার পরিবার, আমার ইবাদত এর কোনো কিছুই আমি ভালো করে দেখাশুনা করতে পারবোনা যদিনা আমার শরীরটা ঠিক না থাকে।

যেহেতু এখন আমাকে বাইরে বেশি যাওয়া আসা করতে হয়না। এই অবসরটুকু আমি কাজে লাগালাম। আর এক্ষেত্রে গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা জনৈক লেখকের একটা চমৎকার কলাম আমাকে দারুন সাহায্য করেছে। লেখকের দাদীমা ২য় বিশ্বযুদ্ধের দুঃসময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন- সবাই যখন শপিং করার ট্রলি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে- তখন আমি কোদাল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করি। যেহেতু আমার ঘরের পেছনে এক চিলতে জমি আছে। সেই জমিতে আমি যতটুকু পারি সব্জি লাগানোর ব্যবস্থা করি। যে সব সব্জি মাস দুমাস কিংবা তিন মাসের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগি হবে। আর এই সব্জিটুকু শুধু নিজের জন্য না- বরং – এরকম ছোট ছোট উৎপাদন একসাথে মিলে অনেক বড় হলে দুঃসময়ে খাদ্য ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করবে। যা শুধু নিজের জন্য না অন্যেরও জন্যও কাজে লাগবে। এই গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও কোদাল নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম।

মানুষ মনে করছে- করোনা থেকে বেঁচে গেলে মৃত্যু থেকেই বেঁচে যাবে- এরকম আশা করবেন না। তবে, দূর্যোগ মুহুর্তে অবশ্যই আপনি সাবধান হবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ফানাহ চাওয়ার পাশাপাশি সরকারের দেয়া গাইডলাইনগুলো ভালো করে মেনে চলবেন। আপনি যেন কোনো অবস্থাতেই অন্যের মৃত্যুর কারণ না হন। কিন্তু পেনিক হবেন না। পেনিক হলে আপনার রোগ ক্রনিক হবে। তখন কিন্তু কোনো টনিকই আর কাজে লাগবেনা। আর স্বাভাবিক থাকতে হবে। আমরা যদি স্বাভাবিক হতাম। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস যে রকম কিনি-একেবারে সেরকমই কেনা কাটা করতাম। তবে দোকান ঘর সবকিছু এতো দ্রুত এরকম খালি হয়ে যেতোনা। আমরা যদি নিজেরাই স্বাভাবিক না চলি- তবে এটা একেবারেই অপরিহার্য যে প্রকৃতিও আমাদের সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করবে।

ঘরের নানা কাজ করার পরও আমি অবসর পেলাম। আর বাইরের কাজ আমার যত কমলো রবের সাথে নীরবে, নিভৃতে সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগও আমার বেশি হলো।

এই হুজুর স্বপ্নের কোনো ঔষধের কথা বলেন নি। কারো ওপর কোনো অভিশাপ বর্ষণ করেন নি। দুনিয়ার সবকিছুই ইহুদি নাসারাদের ষড়যন্ত্র বলে – মানুষকে উত্তেজিতও করেন নি। কিন্তু কি সুন্দর একটা দৈনন্দিন জীবন যাপনের কথা বলে গেলেন। এরকম সুন্দর মনের স্মার্ট আলেম সমাজে যত বেশী হবে। আমাদের সমাজ সত্যিকারভাবে তত বেশীই আলোকিত হবে।

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
মার্চ ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি   এপ্রিল »
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১