নিজ দেশের ভাষায় কথা বললেও লিখতে পারে না এই জাতি!


প্রকাশের সময় :৫ মার্চ, ২০২০ ৬:৩৬ : পূর্বাহ্ণ

প্রজন্ম ভ্রমণ ডেস্কঃ

 

পৃথিবীতে মোট কয়টি ভাষা রয়েছে তার সঠিক তথ্য কারো জানা নেই! তবে জাতিসংঘের তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি ভাষা রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ভাষা হিসেবে পরিচিত হলো চীনের ম্যান্ডারিন ভাষা ও আফগানিস্থানের পশতু ভাষা। তবে বাঙালিদের মতো আর কোনো জাতিই কিন্তু ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি।

 

 

দুর্বোধ্য আর বিলুপ্ত প্রায় ভাষাগুলোর মধ্যে মাল্টিজ একটি। তবে এ ভাষাভাষির মানুষরা তাদের মাতৃভাষাকে হারাতে রাজি নন। এ দেশ ছাড়া এই ভাষা আর অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয় না। তবে এ দুরুহ ভাষার উৎপত্তিই বা কোথা থেকে?

গোল্ডেন বে

গোল্ডেন বে

মাল্টিজ ভাষা বিশেষজ্ঞ ও লেখক জোসেফ ব্রিনকেট বলেছেন, সব ভাষাই অন্য ভাষার থেকে আলাদা। তবে একেক ভাষার উৎপত্তি ভিন্নস্থল থেকে। আর মাল্টিজ ভাষা এসেছে মোট তিনটি ভাষা থেকে। যার মধ্যে প্রথমটি সেমিটিক হিব্রু এবং আরবি অন্তর্ভুক্ত। অন্য দুটি রোমান্স এবং জার্মানিক বৃহত্তর ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার অংশ।

 

 

মাল্টিজকে আরবি ভাষার উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সেখানকার নিকটবর্তী তিউনিসিয়া এবং লিবিয়ার আরবি ভাষাভাষীরা পর্যন্ত মাল্টিজের ৪০ শতাংশ ভাষায় বুঝতে পারেন।

মাল্টিজ ভাষার রয়েছে লিখিত সংস্করণ। কয়েক শতাধিক সেমিটিক ভাষায় মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা জুড়ে এ ভাষা লিপিগুলোতে লেখা হয়। যা হিব্রু বর্ণমালা থেকে শুরু করে ইথিওপিয়ায় ব্যবহৃত গোলাকার গিজ স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত রয়েছে। সেমিটিক ভাষার মধ্যে মাল্টিজ ইংরেজি এবং অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় ভাষায়ও লেখা হয়েছে।

এসটি জনস কো-ক্যাথেড্রাল

এসটি জনস কো-ক্যাথেড্রাল

এখন নিশ্চয় মনে প্রশ্ন আসতেই পারে ভূমধ্যসাগরীয় এ দ্বীপে অদ্ভূত এই ভাষার আবির্ভাব কীভাবে ঘটল? জানা যায়, সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে মুসলিম বিজয়ের সময় এই ভাষাটির উদ্ভব ঘটে। ৮৭০ সালে সিসিলি থেকে আগত আরবরা মাল্টায় আক্রমণ করে। তৎকালীন বাইজেন্টাইন শাসকরা পরবর্তী ২০০ বছর ধরে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর তখনই মূলত আরবি এ ভাষা দ্বীপপুঞ্জগুলোর শেকড় হয়ে যায়।

 

 

ভাষাবিদরা বিশ্বাস করেন, আধুনিক যুগের মাল্টিজ মধ্যযুগে কথিত আরবি ভাষার একটি উপভাষা থেকে এসেছে। পাউডির সমুদ্র সৈকত এবং শিলা বিন্যাস দ্বারা ঘেরা মাল্টা। এটি সিসিলির ঠিক দক্ষিণের একটি দ্বীপপুঞ্জ। সেখানে মাল্টাসহ প্রধানত তিনটি দ্বীপ রয়েছে। যা কেবল ১২২ বর্গমাইল দূরে অবস্থিত। রোমের চেয়ে আফ্রিকার নগরগুলো তিউনিস ও ত্রিপোলির নিকটবর্তী।

মাল্টাকে প্রায়শই ভূমধ্যসাগরীয় মিডপয়েন্ট বলা হয়। মাল্টায় বিজয়ীদের মধ্যে কে হবেন প্রাচীন রোমান থেকে নেপোলিয়ন, বাইজেন্টাইন থেকে ব্রিটিশ। সেই ইতিহাস দ্বীপটির ভূমধ্যসাগরীয় আরবি ভাষাকে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছে।

 

 

ব্রিনকেট বলেন, অর্ধশতাধিক শব্দভাণ্ডার এসেছে সিসিলিয়ান বা ইতালীয় ভাষা থেকে। যা কেবলমাত্র তৃতীয়াংশ মূল আরবিকে প্রতিনিধিত্ব করে। মাল্টা দেড় শতাধিক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যার জন্য আধুনিক মাল্টিজের প্রায় ৮০ শতাংশ ইংরেজি থেকে এসেছে। তবে উচ্চারণের দিক থেকে এ ভাষা বেশ কঠিন।

গ্যান্টিজা মন্দির

গ্যান্টিজা মন্দির

 

মাল্টার সংস্কৃতির একীকরণ

এটি কেবল ভাষা নয়। একই সঙ্গে ক্ষমতার লড়াই। যে দ্বীপগুলোতে মাল্টিজ ভাষা লেখা থাকে। ইউনেস্কো মাল্টাকে বিশ্বের অন্যতম ঘনীভূত ঐতিহাসিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ শহরের উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোর মধ্যে সেন্ট জনস কো-ক্যাথেড্রাল, বারোক শিল্পকর্ম এবং স্থাপত্য অন্যতম।

এছাড়াও রয়েছে সেন্ট নাইটস অব নাইটস এর প্রায় ৪০০ টি সমাধিফলক। যা একটি ধর্মীয় আদেশ ভ্যালেটাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভ্যালেটার সামনে রয়েছে পানি তার ঠিক কিনারায় সেন্ট অ্যাঞ্জেলো অবস্থিত। যখন ১৫৬৫ সালে অটোম্যান সেনারা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে দ্বীপটিকে অবরোধ করেছিল। তখন সেন্ট জন নাইটস ব্যবহার করা হয় কৌশলগত দুর্গ হিসেবে। এ যুদ্ধ একটি বিশেষ রক্তাক্ত পর্ব ছিল। যা সেসময় ইউরোপকে উস্কে দিয়েছিল।

 

 

ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ প্রথম বলেন, তুর্কিদের দ্বীপপুঞ্জ আইল অব মাল্টার বিরুদ্ধে জয়লাভ না করলে খ্রিস্টানদের বিপদ ঘনিয়ে আসবে! সেই সংঘর্ষে, অটোমান সেনাবাহিনী শত্রু বাহিনী খ্রিস্টানদের মাথাবিহীন দেহগুলো ভ্যালেটার গ্র্যান্ড হারবারে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এরপর স্থানীয় খ্রিস্টানরা পালাক্রমে অটোমান বন্দীদের মাথা আলাদা করে ফোর্ট সেন্ট অ্যাঞ্জেলোর কামানের সামনে রেখে উড়িয়ে দেয়।

ডিংলি ক্লিভস

ডিংলি ক্লিভস

 

এভাবেই চলতে থাকে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ। আজ সেখানে ১৫ই সেপ্টেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে সরকারি ছুটি পালন করা হয়। যুদ্ধ পার হয়েছে কয়েকশ বছর পূর্বে। তবে মাল্টার সবচেয়ে প্রাচীন জায়গাগুলোর তুলনায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠ-ক্যাথলিক দেশে খ্রিস্টান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক ইতিহাসের মতো বলে ধারণা করা হয়।

 

 

মাল্টার ঐতিহাসিক স্থানসমূহ

মাল্টা ও গোজো দ্বীপজুড়ে নির্মিত সাতটি মেগালিথিক মন্দির রয়েছে। যা পৃথিবীর প্রাচীনতম মুক্ত-স্ট্যান্ডিং পাথরের কয়েকটি বিল্ডিং। মন্দিরগুলোকে একসঙ্গে ব্রোঞ্জ যুগের এক রহস্যময় উইন্ডো নামে আখ্যায়িত করেছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ৩৬০০ এর মধ্যে নির্মিত কিমের পাহাড় মন্দির।

সেখানে গেলে মনে হবে আপনি আকাশের সারিবদ্ধ একটি পৃথিবীতে প্রবেশ করেছেন। মেগালিথিক মন্দিরের চারপাশে রয়েছে গাছপালা, প্রাণীসহ আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মন্দিরগুলোর ভেতরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক নারী মূর্তি খুঁজে পেয়েছেন। কেউ কেউ অনুমান করেছেন, এই দ্বীপগুলো সন্তান জন্মদান আর দেবী-উপাসনার স্থান ছিল।

কয়েকটি মাল্টিজ শব্দ

কয়েকটি মাল্টিজ শব্দ

প্রাচীন মন্দিরগুলো কারা নির্মাণ করেছিল তা এখনো রহস্যই থেকে গেছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় এবং চতুর্থ সহস্রাব্দে মাল্টা জুড়ে এসব ম্যাগালিথিক মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছিল। তবে তখন কোন ভাষা সেখানে প্রচলিত ছিল তা জানেন না ভাষাবিদরাও। আজ প্রাচীন মাল্টিজ কেবল সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এমনকি সেখানকার টাইমস অব মাল্টা পত্রিকারও ভাষা পাল্টে গেছে। যা সে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত কাগজ। বর্তমানে তারা নতুন ভাষা অর্থাৎ আমেরিকান ইংরেজিই ব্যবহার করছে। এমনকি স্কুল, কলেজসহ অফিশিয়ালভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি। তবে নিজ দেশের ভাষাতেই একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে তারা।

সূত্র: সিএনএনট্রাভেলস

ট্যাগ :

আরো সংবাদ



আর্কাইভ
মার্চ ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি   এপ্রিল »
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১